Friday, September 18, 2015

সুফী সাধনা

সুফী সাধনাঃ
কোথায় থেকে আমাদের আগমন, কোথায় আমাদের গমন, এ ব্যাপারে আমরা খুব বেশি চিন্তা করিনা ।
মৃত্যুর পর কেয়ামত পর্যন্ত আমাদেরকে যেখানে অবস্থান করতে হবে, তার জন্য আমাদের প্রয়োজন আমরা যে ভাবে যে ত্বরিকা মোতাবেক ধর্ম পালন করি তা বিশুদ্ধভাবে জেনে পালন করা এবং জানার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করা । এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান অর্জন করতে হলে কুরআন হাদীসের আলোকে আমাদেরকে অধ্যয়ন করতে হবে, গবেষণা করতে হবে ।
সূফী সাধনায় সাধকের জন্য যে সমস্ত ধাপ গুলো রয়েছে তা বড়ই বিশাল ।

সুফী সাধনায় পাঁচটি ধাপ রয়েছে। যথা-শরীয়ত, তরীকত, মারেফত, হাকিকত । শরীয়ত ছাড়া বাকী চারটি ধাপকেই তরীকতের পর্যায়ভুক্ত বলে গণ্য করা হয় । কুরআন হাদিসের আলোকে সুফী সাধকগণ সুফী সাধনায় এই পাঁচটি ধাপ সঠিকভাবে অতিক্রম করতে পারলে সুফী সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয় বলে উল্লেখ রয়েছে ।

সূফী সাধনার প্রথম ধাপ শরীয়ত : শরীয়ত শব্দটি ‘সারয়া’ শব্দ থেকে উদ্ভুত । ‘সারয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সহজ সরল পথ, প্রধান সড়ক ইত্যাদি । আবার শরীয়ত শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রকান্ড নদী, প্রবাহিত জলস্রোত, বৃহত্তম জন সড়ক প্রভৃতি । ইসলামের পারিভাষিক অর্থে শরীয়ত হলো কুরআন সুন্নাহ (হাদীস) ইজমা (মতৈক্য) এবং কিয়াস (অনুসরণ যোগ্য) প্রমানাদি দ্বারা গৃহীত ইসলামের জীবন বিধান বা জীবন ব্যবস্থা। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত যেসব বিধি বিধান সমূহ হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর মাধ্যমে মানব জাতির প্রতি নির্দেশ ও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, একেই ইসলামের পরিভাষার শরীয়ত বলা হয়। ফেকাশাস্ত্রের ইমামগণ কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা মানব জাতির জীবন ব্যবস্থা যেভাবে নির্দেশ ও নির্ধারণ করে গিয়েছেন তাকেই শরীয়ত বলা হয়। ইসলামের ফেকা শাস্ত্রে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এমনকি আন্তর্জাতিক জীবন বিধান পর্যন্ত নির্দেশিত হয়েছে । ইসলামের এই নির্দিষ্ট জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ কেননা পবিত্র কুরআনের ভাষায় ঘোষিত হয়েছে যে ইসলামের জীবন ব্যবস্থা ব্যতিরেকে অন্যকোন রকম জীবন ব্যবস্থাই আল্লাহর নিকট গৃহীত নয় ।
ইসলামে শরীয়ত ব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালিত হবার পিছনে যে উদ্দেশ্য তা হলো মানবজাতির ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন এবং আন্তর্জাতিক জীবনে যাতে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধান করা যায় এবং জীবনের স্থিতিশীলতা যাতে রক্ষা করা যায়।
শরীয়ত পন্থীদের জন্য শরীয়তের পাঁচটি কার্য সম্পাদন করা ফরজ। যেমন- ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত।
হজ্ব এবং যাকাত ধনীলোকদের জন্য ফরয সকলের জন্য নয়। শরীয়ত পন্থীরা যখন শরীয়তের যাবতীয় অনুশাসন মেনে চলে এবং শরীয়তের নির্দেশাবলী তাদের জীবনে বাস্তবায়িত করেন। শরীয়তের উদ্দেশ্যাবলী জীবনে বাস্তবায়িত যখন হয়ে উঠে তখনই তার জন্য শরীয়তের শিক্ষা থেকে তরীকতের দীক্ষা নেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। শরীয়ত থেকে তরীকতে শিক্ষানেবার সাধনাকেই বলে সুফী সাধনার পথ । শরীয়ত ও ত্বরীকত একটি অপরটির সম্পূরক। তরীকত শরীয়তের বাহ্যিক ধর্মানুষ্ঠানগুলো আভ্যন্তরীন বিশুদ্ধতা, পরিপক্কতা, সার্থকতা ও সফলতা এনে তরীকত শরীয়ত পন্থীকে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছে দেয় । যেহেতু তরীকত শরীয়ত পন্থীকে তার ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় এবং উপকরণ হিসাবে কাজ করে থাকে এজন্যই শরীয়ত পন্থীকে তরীকত ব্রতী হওয়া আবশ্যক। শরীয়ত পন্থীগণ যখন তরীকতের উচ্চ স্তরে পৌঁছাতে সক্ষম হন, তখন তিনি তার মাশুকের সাথে মিলন কামনায় অধিকতর ব্যাকুল হয়ে উঠেন । মাশুকের সান্নিধ্য লাভে নিজেকে ধন্য করে নিতে চান । প্রেমময়ের প্রেমে প্রেমিকের মন প্রাণ তখন ছটপট করতে থাকে বিরহ ব্যথায় । তখন তিনি সারাক্ষণ আল্লাহ পাকের আরাধনায়-উপসনায় নিমগ্ন থাকতে ভাল বাসেন । তিনি তখন জাগতিক লোভ লালসা ও মায়ামোহ থেকে নিরাসক্ত হয়ে পড়েন । প্রেমিক তখন প্রেমময়ের প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান । তখন শরীয়ত তরীকত দ্বারা অর্থবহ হয়ে উঠে । তাই শরীয়ত হলো দেহ, তরীকত হলো প্রাণ বা আত্মা । ইসলামের বাহ্যিক জীবন ব্যবস্থার নাম শরীয়ত । আর আত্মার উৎকর্ষ সাধনের নাম ত্বরিকত ।

No comments:

Post a Comment