Friday, September 18, 2015

মন ও আত্মা দুটোই মানুষের আলাদা আলাদা সত্তাঃ
মন ও আত্মা দুটোই মানুষের আলাদা আলাদা সত্তা। মন হচ্ছে এক প্রকার শক্তি যা মানুষের ভাল মন্দ কাজের প্রেরণা যোগায়। একে আমরা মানসিক শক্তিও বলে থাকি। মনের ৪টি অবস্থা ১) অচেতন ২) অবচেতন ৩) চেতন ও ৪) সচেতন। আর আত্মা হচ্ছে মানুষের প্রাণশক্তি যার মাধ্যমে মানুষ জীবিত থাকে। আত্মার অনুপস্থিতি মানেই জীবের প্রয়াণ সাধন। আত্মা ৫ প্রকার যথাঃ ১) পরম আত্মা, ২) জীব আত্মা, ৩) আত্মা রাম, ৪) রামেশ্বর ও ৫) ভুত আত্মা। একটি দর্শন চালু হতে হলে এর সাথে আনুসাঙ্গিক অনেক কিছুই লাগে দর্শনটি মজবুত করার জন্যেবর্তমান দেহতাত্ত্বিকগণ তাদের আলোচনায় পরমাত্মা এবং জীবাত্মাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন বাকি গুলো এরিয়ে গেছেন। তবে কথা হচ্ছে পরম যেহেতু সর্বভুতে সুতরাং পরম মরা লাসের সাথেও থাকে। তাহলে মৃত লাস মৃত হল কি করে?
যত দিন পরম আত্মা এবং জীবাত্মা এক সাথে থাকে তত দিনই একটি প্রানী জীবিত থাকে যেই মাত্র তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সাথে সাথেই দেহটি মরা লাস বলে ঘোষিত হল। জীবাত্মা হচ্ছে জীবদেহের বিদ্যু শক্তি যতক্ষণ দেহের ভেতরে উপন্ন হবে এবং দেহের বিভিন্ন স্থানে সঞ্চার হবে ততক্ষণ দেহ জীবিত। কোন কারনে তার ব্যাঘাত ঘটলেই পরমাত্মা হতে জীবাত্মা আলাদা হয়ে যাবে। একারণে একজন মানুষের প্রথম এবং শেষ ইবাদত হচ্ছে হুঁশে চলা অর্থা হুঁশে চলতে হবে। বেহুঁশের কোন বন্দেগী নেই

আত্মা ৫ প্রকার যথাঃ পরম আত্মা, জীব আত্মা, আত্মা রাম, রামেশ্বর ও ভুত আত্মা:
আদি-অন্ত জ্ঞান সাধন, আদি-অতীত জ্ঞান সাধন, আত্মা সম্পর্কে জ্ঞান সাধন = আধ্যাত্মিক সাধন। আমি কে? আমি কোথায় ছিলাম? আমি কোথায় যাব? মূলত আত্মার সাধন থেকেই আধ্যাত্মিক সাধকের উপত্তি হয়েছে। আত্মা হচ্ছে মানবের সবচেয়ে আদি/পুরাতন দৈবিকা। সনাতন ধর্মাবলম্বনকারীদের ধর্মিয় গ্রন্থে এই আত্মা শব্দটা প্রথম মিলে। আত্মা ৫ প্রকার যথাঃ পরম আত্মা, জীব আত্মা, আত্মা রাম, রামেশ্বর ও ভুত আত্মা। নিজেকে চেনা, নিজেকে জানার কথা এলেপ্রথমেই যে কথা মনে আসে তা হচ্ছে আত্মা। কিন্তু আত্মাকে সরাসরি চেনা, জানা যায় না। যদি অন্যভাবে বলি তবে সরাসরি আত্মার ধারে কাছেও যাওয়া যায় না কেউ পারেনি। যেতে হয় কৌশলে সাধন বলে। আবার কেউ চাইলেই সরাসরি আত্মার সাধন করতেও পারবে না। তাকে অন্যান্য দৈবিকা এবং বিষয় যেমন দেহ, মন, জ্ঞান, রিপু, রুদ্র, দশা, মন্দা ইত্যাদি ঘুরে আসতে হবে। যদি গোটা মানুষটাকে প্রাথমিক ভাবে শুধু দুই ভাগে ভাগ করি তবে যা আসে তা হলো ১) স্থুল জগত/জাহের, ২) সূক্ষ্ম জগত/বাতেন। দেখাযাচ্ছে কেবল দেহটাই স্থুল জগতের মধ্যে পরেছে আর বাকি প্রায় সবিই পরেছে সূক্ষ্ম জগতে। সূক্ষ্ম জগতে কেউ সরাসরি প্রবেশ করতে পারেনা, তাকে অবশ্যই স্থুল জগত জয় করে আসতে হয়। দেহকে প্রকৃত রূপে জানাই দচ্ছে দেহতত্ত্ব। দেহ হচ্ছে পরম স্রষ্টার একটি বড় দান। যার দেহ ঠিক নেই তো তার অনেক কিছুই ঠিক নেই। দেহটা হচ্ছে ভাণ্ড অনেকটা ডাবের মতই খোসা ছাড়াতে পারলেই ভেতরে অন্য কিছু পাওয়া যাবে নিয়ামত স্বরূপ। সময় থাকতেই দেহের বস্তু ঠিক রাখতে হয় নচে সূক্ষ্ম জগতে খুব বেশি বিচরণ করা যায় না। আগেই বলা হয়েছে বস্তুটা কুপির তেল রূপে কাজ করে, সুতরাং ঐ জগতে ততক্ষনিই টিকে থাকা যাবে যতক্ষণ ভাণ্ডে বস্তু থাকবে। বর্তমানে সাধনে কেউ আর অতটা উর্ধে গমন করতে পারেনা, কারণ কোন কিছু বুঝার আগেই প্রয়াণ ঘটে যায়। আর কিছু জ্ঞান, মাত্র আর কিছু জ্ঞান করতে করতেই সময় চলে যায়। ফকির লালন সাঁই বলেগেছেন সময় গেলে সাধন হবেনা...
অসময়ে কৃষি কইরে
মিছা মিছি খেইটে মরে
গাছ যদি হয় বীজের জোরে
তাতে ফল ধরে না !!

রুহুকে পাঁচ ভাবে পাওয়া যায় যথাঃ রুহে সুলতানি, রুহে জিসমানি, রুহুল্লাহ, রুহুল কুদ্দুস ও রুহুলামিন:
কোরানে আমি যতটুকু পড়েছি তাতে আত্মা শব্দটা পাই না (যদি কেউ পেয়ে থাকেন দয়া করে আয়াতটুকু কমেন্ট বক্সে লিখে দিবেন), ওখানে যা পাওয়া যায় তা হলো ‪#রুহরুহের সাধন > রুহানি সাধন, রুহের সাধক > রুহানি সাধক। মুলত এই রুহ শব্দটা থেকেই রুহানি সাধকের উপত্তি। এখানে রুহুকে পাঁচ ভাবে পাওয়া যায় যথাঃ রুহে সুলতানি, রুহে জিসমানি, রুহুল্লাহ, রুহুল কুদ্দুস ও রুহুলামিন। কালের বিবর্তনে কোরানে বর্নিত সালাত, সাওম এখন আমাদের কাছে হয়েগেছে যেমন নামাজ, রোজা ঠিক তেমনি রুহের নামেও এসেছে পরিবর্তন। এখন যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে যেমনঃ নামাদি, জামাদি, হায়ানি, ইনসানি ও রুহে কুতসি। নামগুলো নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক রয়েছে অনেকের মধ্যে। অনেকে বলে রুহ এবং আত্মা দুটোই আলাদা আবার অনেকে বলে যে রুহ এবং আত্মা একই জিনিস। মাতৃ গর্ভে থাকা কালীন একটি শিশুর মধ্যে রুহ প্রবেশ করে এবং ভূমিষ্ঠ হওার আগ পর্যন্ত সে রূহানী জগতেই থাকে। ভূমিষ্ঠ হাওয়ার পর শিশুটি কাদতে থাকে হয়তবা তার কাছে আগের জগতটাই ভালো লেগেছিল। হাঁয় এ আমি কোথায় এলাম শুরু হয় কান্নাকাটি আবার আগের জগতে ফিরে যাওয়ার জন্যে। জ্ঞান হওয়ার পর অনেকের মনে থাকেনা আবার অনেকেই সাধু মণি ঋষির সান্নিধ্যে গিয়ে আবার চেতন হয় রূহানী জগতে ভ্রমনের আশায়। একজন বাউল সাধক তার গানের মধ্যে লিখে গেছেন...
পঞ্চ আত্মা পঞ্চ রুহু হিসেবেতে দেখতে পাই
একেতে হয় দুয়ের জনম পরম আত্মার মরন নাই
পরম আত্মার কর্ম নিয়া জীব আত্মা যায় বিলিন হইয়া
জন্ম মৃত্যু নাম ধরিয়া চালাইছে কারবার... (দেওয়ান মন্সুর)

প্রত্যেকটি মানুষের সামনে বরাবর একটি আয়না, দর্পন, আরশী থাকে। সামনে তাকালে এপার থেকে ওপার সরাসরি সুস্পষ্ট দেখা যায়। এটাকে অনেকে এড়ফাণী আয়নাও বলে। ভাববাদে মিলে অগ্নি (এস্কের আগুন) যে অগ্নিতে নিজের পাপকে পোড়ানো হয় এবং কালিমাটুকু লেপন করা হয় আয়নার অপর প্রান্তে, যেন আর ঐ প্রান্ত সরাসরি না দেখা যায়। এবার গভীর ভাবে আরশী বরাবর তাকালে ওখানে আর অন্য কিছুই দেখা যায়না নিজেকে ছাড়া। একেই বলা হয় স্বরূপ যে দিকেই তাকায় শুধুই সে। ফকির লালন সাঁই তার একটি গানে বলেছেন
বাড়ির কাছে আরশী নগর
সেথা পড়শী বসত করে-
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
অবশ্য এই গানটি অনেকেই ত্রিবেনী হতেও বিশ্লেষণ করে। কারণ এখানে পানি উল্লেখ আছে...
গেরাম বেড়ে অগাধ পানি
নাই কিনারা নাই তরণী পারে
বাঞ্ছা করি দেখব তারে
আমি কেমনে সেথা যাই রে।

জোর পুর্বক কেউ নিজের মধ্যে তেমন কোন পরিবর্তন আনতে পারেনা। পরিবর্তন ঘটে যারযার নিজের কর্মে, কর্মদোষে মন্দ আর কর্মগুণে ভালো। কোন কর্ম করার আগে তাঁর সম্পর্কে সাম্যক ধারনা লাভ করাই ৫০% কাজ আর বাকিটুকু হচ্ছে তা বাস্তবায়ন। আমাকে আগে লক্ষ্য স্থির করতে হবে আমি কি করতে চাই এবং তাঁর সম্পর্কে যথেষ্ট ধারনা/জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বুদ্ধিযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ধ্যানযোগ যোগে থাকাই উত্তম পন্থা। মানুষ তাঁর কর্ম এবং সঠিক জ্ঞানের সাধনার মাধ্যমেই একজন সাধারন মানুষ থেকে মহামানবে পরিণত হয়ে যায়।
আপন কর্মে/সাধনায় সিদ্ধ হলেই কেবল কাউকে সাধু বলা যায় তার আগে বলা যায় না:
আপন কর্মে/সাধনায় সিদ্ধ হলেই কেবল কাউকে সাধু বলা যায় তার আগে বলা যায় না, তবে যিনি সাধনা করেন তাকে সাধক বলা যাতে পারে। তবে কথা হচ্ছে কর্মটা কি? নিজেকে জানা/চেনা (মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু)। পরম সকলের মাঝেই আছেন মূলত পরমকে চেনা/জানাই হচ্ছে আপনাকে চেনা/জানা। পরমকে দর্শন করতে হলে সাধনার বিভিন্ন ষ্টেজের মধ্যে একটি ষ্টেজ হচ্ছে পঞ্চরসের সাধনা। এখন কথা হচ্ছে আমাদের আশেপাশের অনেকই পঞ্চরসের সাধনাকেই পরম সাধনা হিসেবে ধরে নিয়েছে, আসলে এটা হচ্ছে একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ। যদি খুব সাধারন ভাবে ভাবেন তাহলেই বুঝতে পারবের আশাকরি। যেমন যার স্ত্রী নেই অথবা যার স্বামী নেই সে কি পরম সাধনা করবে না?
এখন আমি জানি জলপথের বর্ননা তাই আমি আমার শিষ্যদের শিক্ষা দিলাম জলপথে পাড়ি দেওয়ার পদ্ধতি আর বাকি দুটো পথের কথা বল্লাম না। আসলে স্থলপথ এবং আকাশ পথের ব্যাপারে আমি জানিই না। এবার বলুন শিষ্যরা কি ঠিক পথে রইল নাকি তাদের জানায় ভুল রয়ে গেল? তারা যখন পরবর্তিতে বিভিন্ন সভায় যাবে তারা হয়ে যাবে হতভম্ব, কারণ তাদের জানাটা ঠিক নেই গুরুই ভুল শিখিয়েছেন।
সেক্স = সাধনা এটা সত্য, কিন্তু সাধনা = সেক্স এটা বলা যাবে না। কারণ সাধনার পরিধিটা অনেক অনেক বড় এখানে সেক্সের স্থান ১০০% এর মধ্যে ১% হতে পারে। এখন এটাকেই যদি ১০০% ধরে নেই তাহলে কেমন হবে? বিবাহিত আর অবিবাহিতদের সাধন পন্থাতো এক হতে পারেনা। যার সাধন সঙ্গিনী নেই তার ঐ জ্ঞানটুকু না হলেও বিশেষ কোন সমস্যা নেই।

যদি কোন গাঁজাখোর আপনাকে অতি সুপরামর্শও দেয়, দয়া করে বর্জন করুন। তার জ্ঞান গ্রহন করার কোন দরকার নেই। কাউকে সাধু গুরু বলার আগে তার নিজের সব কিছু ঠিক আছে কিনা আগে তা যাচাই করে দেখেন। কোন জ্ঞানে তাকে সাধু বলা যায় আগে তা নিজে চিন্তা করে দেখেন। সাধন সংক্রান্ত কোন জ্ঞান কারো কাছ থেকে গ্রহন করার আগে তা যথেষ্টবার যাচাই করুণ...
ফকির লালন সাঁই বলে গেছেন তার গানের শ্লোকেঃ
সপ্ততলা ভেদ করিলে
হাওয়ার ঘরে যাওয়া যায়
হাওয়ার ঘরে গেলে পরে
অধর মানুষ ধরা যায় ...
এটা যে আকাশ পথ তথা শূন্য মাধ্যম এতে কোন সেন্দেহ নেই। দেহের মধ্যে সাত আসমান আছে এখানে তার কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু কিছু লোক এটাকেও ত্রিবেণীতে নিয়ে ঠেকিয়েছেন। দয়া করে নিজের প্রতি সাবধান হয়ে যান। লালনকে না বুঝে লালন চর্চা না করাই ভাল। লালন গীতি শোনার জন্যে নয় বরং বুঝার জন্যে রচিত হয়েছে।
অজ্ঞানীর মহাসমুদ্র পাড়ি আর জ্ঞানীর মাত্র এককদম পথ চলা সমান কথা...

No comments:

Post a Comment