আল্লাহ সুবাহানাওতায়ালা বলেন,
“এবং তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁক দেব ”[হিজরঃ২৯]
মানুষ আত্মা এবং দেহের সমন্বয় গঠিত।একে অপরের ছাড়া অচল।দেহ মানুষের বাহ্যিক বিষয় তাই এর ভুল-ত্রুটি সর্বদা আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে।আর মানুষ দৈহিকভাবে রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ তার চিকিৎসাকরায়।কিন্তু এই মানুষের দেহ কেবল মাত্র এই দুনিয়ার জীবনের জন্য আর আত্মা মানুষের আখিরাতের জীবনের সাথে সংক্লিষ্ট।আত্মিক চিকিৎসা দৈহিক চিকিৎসার পাশাপাশি অপরিহার্য একট বিষয়।আর এটাবাতিনিভাবে করতে হয়।কেউ যদি আত্মাকে পরিশুদ্ব করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সে আখিরাতে কাংখিত সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হবে।তাই আত্মার পরিশুদ্বতা অর্জন করা একান্তভাবে অপরিহার্য একটি বিষয়।আরএকেই বলা হয় আত্মিক পরিশুদ্বতা।আত্মা কি,তার উপায় এবং তার প্রয়োজনীয়তে সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হলঃ
আত্মার আভিধানিক অর্থ
আত্মা অর্থ হল দেহবিশিষ্ট চৈতন্যময় সত্ত্বা,অধিদেবতা,স্বরুপে স্বয়ং,অন্তর্নিহিত শক্তি,প্রাণের মধ্যবিন্দু,কেন্দ্রবিন্দু,প্রাণকে চঞ্চল করে তুলে এমন উজ্জীবক,গভীর অনুভূতিকে জাগ্রত করে এমন ,soul, immortal part of the body, ego, essence ইত্যাদি।আরবী ভাষায় একে রুহ এবং কলব বলা হয়।
মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় আত্মা হল মন।দর্শনে soul, mind, self. বুৎপত্তিগত অর্থে যা পূর্ব অভিজ্ঞতায় স্মরণ রাখতে পারে তাই হল আত্মা।
আত্মার পারিভাষিক সংজ্ঞা
আত্মার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে কেউ কেউ বলেছেন মানবদেহে যে প্রবাহমান রক্ত সেই রক্ত হল আত্মা।
আবুল হায়সাম বলেন, “আত্মা এমন বিষয় যা মাধ্যমে মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে।যা মানুষের ভিতর হতে বের হয়ে গেলে মানুষ মারা যাবে।”
আল-ফাররার মতে, “আত্মা হল এমন বস্তু যার উপর মানুষের জীবন নির্ভরশীল।”
ইমাম গাযযালী(রঃ) বলেন, “আত্মা হল মানুষের দেহ সংক্লিষ্ট এবং দেহোত্তীর্ণ আধ্যাত্মিক সত্ত্বা।”
ইবনুল আরাবীর মতে, “আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভের উপায় এবং মাধ্যম হল আত্মা।”
আল্লামা ইকবাল বলেন, “আত্মা হল এক ধরনের বাস্তব সত্তা যাকে অতীন্দ্রীয়ানুভূতির মাধ্যমে জানা যায়।”
সারকথা হল এই যে,আত্মা এমন এক বিষয় যা চিরন্তন,অমর,অবিনশ্বর,অদৃশ্য এবং সর্বত্র বিরাজমান এবং যা মানুষের প্রাণশক্তিকে সঞ্চার করে। আত্মার প্রকারভেদ দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক মতে আত্মা তিন ধরনের হয়।তা হল
(১)রুহে হায়াতীঃ এ আত্মার অবস্থান হৃৎপিন্ডে।এর সাথে তার জীবন এবং তার স্বস্তি এবং সুস্থতা সম্পর্কিত।
(২)রুহে তবয়ীঃ এর অবস্থান রক্ত।এর মাধ্যমে মানুষের শক্তি,সামর্থ্য এবং কর্মক্ষমতা সংক্লিষ্ট।
(৩)রুহে নাফসানীঃ এর অবস্থান মাথা।এই রুহ হল অনুভূতি এবং চেতনার মূল।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আত্মা তিন প্রকারের হয়।তা হল রাওমামা,আম্মারা এবং সুদৃঢ় আত্মা।
ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে আত্মা তিন প্রকারের তা হলঃ
১.মুয়াম্মারা
২.মুতমাইম্মা
৩.লাওয়াম্মা
২.মুতমাইম্মা
৩.লাওয়াম্মা
আত্মার স্তরসমূহ
আত্মার স্তর হল তিনটি যা হল রুহে আযীম,রুহে কুদ্দুস এবং রুহে নফস।
আত্মশুদ্বি
আত্মশুদ্বিকে আরবী ভাষায় তাযকিরাতুন নফস বলা হয়।এখানে তাযকিরাতুন কথাটি ঝায়িয়ুন হতে নির্গত হয়েছে যার অর্থ হল পবিত্র,নিষ্পাপ।আর তাযকিরাতুন অর্থ হল পরিশুদ্ব করা,পাক করা, উদ্বুদ্ব করাএবং উন্নত করা। আর নফস এর অর্থ হল আত্মা। আত্মার পারিভাষিকে সংজ্ঞস নিম্নরুপঃ
“আত্মশুদ্বি এমন একটি বিষয় যার দ্বারা আত্মাকে সংশোধন করা যায়,আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এবং তার মারিফত অর্জন করা যায়।”
পারতপক্ষে আত্মশুদ্বি ছাড়া কখনও একটি মানুষ ভাল মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
আত্মশুদ্বির উপায়সমূহঃ
আত্মাকে বেশ কয়েকটি অবস্থায় বিশুদ্বতা অর্জন করা যায়।যেসকল বিষয় আত্মিক পরিশুদ্বতা অর্জন করা তা হল নিম্নরুপঃ
১. ঈমান পরিশুদ্বকরনঃ তাযকিয়াতুন নফসের চাবি হল ঈমান।আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনলে আত্মশুদ্বি হবে না।ঈমানদারদের জন্যেই আত্মশুদ্বি।কাফিরদের জন্য আত্মশুদ্বি নয়।সত্যিকারের আত্মশুদ্বি অর্জনকরতে হলে ঈমানকে তাজা এবং শক্তিশালী করতে হবে।আর এই ঈমানকে তাজা করার জন্য ইলেম অর্জন করতে হবে।ইলম ছাড়া ঈমান কখনও তাজা হবে না।আল্লাহ বলেন,
পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষাদিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। [আলাকঃ১-৫]
২. তাকওয়াঃ তাকওয়া শব্দের অর্থ হল আল্লাহকে ভয় করা,সাবধান থাকে,সতর্ক থাকা,বিরত থাকা ইত্যাদি।শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ পাকের ভয়ে যাবতীয় পাপাকার্য থেকে বিরত থাকের নাম হলতাকওয়া।তাকওয়ার দ্বারা যেকেউ নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ব করতে পারে।।আল্লাহ বলেন,
“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ্ তাদের সাথে রয়েছেন”। [বাকারাঃ১৯৪]
“পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে,তার ঠিকানা হবে জান্নাত”। [নাযিয়াতঃ৪০-৪১]
৩.তওবাঃতওবা অর্থ হল অনুতপ্ত হওয়া,লজ্জিত হওয়া, ফিরে আসা,প্রত্যাবর্তন করা ইত্যাদি।অর্থাৎ,আল্লাহের হুকুম অমান্য করে বা সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তি কর্তৃক চরম অনুশোচিত হয়ে আল্লাহর কাছে অপরাধস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বিনয়ের সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করার নাম হল তওবা। অর্থাৎ,গুনাহ করার পর সেখান তা থেকে যদি কেউ পরিত্রান পেতে চায় এরজন্য তাকে আল্লাহের কাছে সর্বপ্রথম একনিষ্ঠভাবে তওবা করতেহবে যে আরধনার মাধ্যমে যেকেউ আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য লাভ এবং আত্মপরিশুদ্বতা অর্জন করতে পারে।তওবার মানে শুধু এই না যে সে পাপের জন্য কেবল ক্ষমা চাবে না বরং সে পাপ কাজটি না করার জন্য সেদৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবে।অন্যথায় তা তওবা হবে। আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদের ভালবাসেন”[বাকারাঃ২২২]
রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, “তওবাকারীদের কোন গুনাহ থাকে না।।”
অর্থাৎ, তওবার দ্বারা অতি সহজে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়।
৪.তাওয়াক্কুলঃসর্বাবস্থায় এক আল্লাহের উপর কেবল নির্ভর হওয়াকে তাওয়াক্কুল বলা হয়।তাওয়াক্কুলের ধারনা তাওহীদ হতে এসেছে।এক সর্বশক্তিমান আল্লাহের উপর নির্ভর করা ছাড়া আর অন্য কোন শক্তিউপর নির্ভর করা ইসলামবিরোধী।ইমাম গাযযালি(র.) বলেন,”তাওয়াক্কুলের অবস্থা তিন ধরনের হয়।প্রথম অবস্থা হল এমন যে সে সাধারণভাবে আল্লাহের উপর নির্ভর করবে।দ্বিতীয়ত,তাওয়াক্কুল্কারী ব্যক্তিরঅবস্থা এমন হবে যে একজন শিশু তার প্রতি ঠিক যেমন নির্ভর করে অর্থাৎ তার মাতা ছাড়া আর কারও আশ্রয় লাভ করে না ঠিক তদ্রুপ ঐ ব্যক্তি আল্লাহের প্রতি এমন নির্ভর করে থাকবেন। আর সবশেষ স্তরহল এমন যে সে পৃথিবীর কোন কিছুর প্রতি মুখাপেক্ষী নয় এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি।আত্মশুদ্বির জন্য এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। রাসূল (সাঃ) বলেন,
“তোমরা এমনভাবে তাওয়াক্কুল যেমনিভাবে একটি পাখি আল্লাহের প্রতি তাওয়াক্কুল করে।অর্থাৎ সে সকালে বের হয় অনাহারে আর বিকালে ঘরে ফিরবার পূর্বে পেটপূর্ণ হয়ে ফিরেআসে”। [তিরমিযী]
আল্লাহ বলেন,
“এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহ্ই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তাঁরই ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশেরঅধিপতি।” [তওবাঃ১২৯]
৫.ইখলাসঃ সূফী-সাধকগণ হৃদ্বের পবিত্রতা ও সরলতা রক্ষা করে চলে।তারা সর্বদা আল্লাহের ধ্যানে মশগুল থাকে।তারা তাদের চিন্তা-ধারার সময় আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে আনেন না।যাবতীয় সন্দেহযুক্ত কাজবর্জন,বিবেকবিরোধী কার বর্জন করা এবং যা আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যায় এমন কাজ বর্জন করা পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম সহায়ক।আল্লাহের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন ও পার্থিব মোহ এড়ানোর মাধ্যমেসূফীগণ অন্তরে পবিত্রতা অর্জন করেন।আল্লাহ বলেন,
“আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কোরবাণী এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্যে।” [আনআমঃ১৯২]
রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেন,“ইখলাসওয়ালাদের জন্য সুসংবাদ হোক।তারা অন্ধকারে চেরাগস্বরুপ।তাদের দ্বারা কঠিন হতে কঠিন ফিৎনা দূর হয়”।[বায়হাকি]
৬.যিকিরঃযিকিরের আভিধানিক অর্থ হল স্মরণ করা।শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ পাকের স্মরণ করাকে যিকির বলা হয়।যিকির বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যে ধরনের যিকির নীরবে হয়ে থাকে সেসকলযিকিরকে যিকিরে কালবী বা যিকিরে খফী বলা হয়।আর যে ধরনের যিকির স্বশব্দে উচ্চারিত হয় তা হল যিকিরে জলী বা যিকিরে লিসানী।এ দু ধরনের যিকিরের মাধ্যমে বান্দা নিজের আত্মাকে পূত-পবিত্র করতেপারে।যিকির করার ফযীলত অপরিসীম।আল্লাহ বলেন,
“সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো” [বাকারাঃ১৫২]
“ মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর এবং সকাল বিকাল আল্লাহ্র পবিত্রতা বর্ণনা কর”।[আহযাবঃ৪১-৪২]
৭. কুরআন তিলওয়াতঃ কুরআন তিলওয়াত হল নফ্ল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত।কুরআন তিলওয়াতের মাধ্যমে একজন বান্দার সাথে আল্লাহ পাকের কথোপকন হয় এবং যিকিরের মর্যাদা লাভ করতে পারে।তার মানবিক গুণাবলী বৃদ্বি পায়।রাসূল(সাঃ) বলেন, “লোহার উপর যেমন মরীচা পড়ে তেমনিভাবে মানুষের অন্তরের উপর মরীচা পড়ে।আর এই মরীচা দূর করার উপায় হল বেশি বেশিকরে কুরআন তিলওয়াত এবং মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা।”
৮.সুন্নাতকে অনুসরণঃ সুন্নাত অর্থ হল পথ।রাসূল(সাঃ)এর পথকে অনুসরণ করাকে সুন্নাত বলা হয়।সুন্নাতকে অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর একজন প্রিয়বান্দা আত্মশুদ্বি অর্জন করতে পারে।মুসলমান হিসেবেসুন্নাতকে অনুসরণ করা সকলের জন্য জরুরি।আল্লাহ বলেন,
“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ্ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন।” [ইমরানঃ১৩১]
“যে লোক রসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহ্রই হুকুম মান্য করল।”[নিসাঃ৮০]
৯.নেক আমল করাঃআত্মশুদ্বি করার আরেকটি বিশেষ রাস্তা হল নেক আমল করা।শুধুমাত্র ঈমান থাকলে হবে না।ঈমানের দাবী অনুযায়ী কাজ করতে হবে।আর মানব সৃষ্টির অন্যতম লক্ষ্য হল আল্লাহ পাকেরজন্য ইবাদত তথা নেক আমল করবে।এই ইবাদত –বন্দেগীর দ্বারা একজন বান্দা আত্মশুদ্বি অর্জন করতে পারে।আল্লাহ বলেন,
“আমি জীন এবং ইনসানকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।” [যারিয়াতঃ৫৫]
১০.সালাত আদায়,যাকাত প্রদান,সিয়াম সাধনা এবং হজ্জ পালনঃ সালাত,সিয়াম,হজ্জ এবং যাকাত হল ইসলামের পঞ্চসম্ভের ভিতর অন্যতম।পারতপক্ষে এসকল আমল ছাড়া কেউ কখনও মুসলিমথাকতে পারে না।এসকল আমলসমূহের দ্বারা আত্মশুদ্বি অর্জন করা যায়। এ ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে অসংখ্য উদ্বৃতি পাওয়া যায়।তা হলঃ
“নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে।”[আনকাবূতঃ৪৫]
“তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহকর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে”।[তওবাঃ১০৩]
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।” [বাকারাঃ১৮৩]
১১. সবর করাঃ সবর অর্থ হল ধৈর্য।আর ধৈর্য হল ঐ বিষয়টি যার সাহায্যে একজন মানষ তার বিপদ-আপদ,সুখে-দুখে,ক্ষুধা-তৃষ্ণায়,অত্যাচার-অবিচার ইত্যাদি সর্বাবস্থায় এক আল্লাহের ইবাদত বন্দেগীতে মগ্নথাকবে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের পথ অনুসরণ করে।ধৈর্যের তিনটি স্তর রয়েছে।এক ধরনের ধৈর্য আছে যাতে মানুষের ভিতর কখন সবর থাকে আবার কখন থাকে না।আবার আরেকটি স্তর হল কখনো মন্দঅবস্থায় সে দিশেহারা হবে না।আর সর্বশেষ স্তরটি হল এমন যে সে কখনো দুঃখ-কষ্টের জন্য কখনও বিচলিত হবে না।এ সর্বশেষ স্তরের দ্বারা যে কেউ তার এই সবরের গুণে সূফিবাদের চরম লক্ষে পৌছে যায়।ইমাম গাযযালী (র.) বলেন, “ধৈর্য হল শয়তানের প্ররোচনা অ আত্মার নিম্নতর প্রবৃত্তি সম্পর্কে হুশিয়ারীতে পূর্ণ বিশ্বাস”। সবরের দ্বারা যে আল্লাহ পাকের ভালবাসা একান্তভাবে অর্জন করা যায়তা নিমোক্ত আয়াত দ্বারা প্রমানিত হয়। আল্লাহ বলেন,
“হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ্ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।”[বাকারা]
১২.শোকর আদায় করাঃশোকর শব্দের অর্থ হল কৃতজ্ঞতা।আল্লাহ পাক একজন মানষকে যে হাত,পা।চোখ,নাক,কান,মুখ,বাতাস,রিযিক,পানি দিয়েছে তার জন্য আল্লাহের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নাম হলসাধারণভাবে শোকর।শোকর আদায়ের মধ্য দিয়ে একজন বান্দা আত্মশুদ্বিতা অর্জন করতে পারে।আল্লাহ বলেন,
“যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব” [ইব্রাহীমঃ৭]
১৩. আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণঃএকজন শিক্ষকের প্রতি তার ছাত্র পুরোপুরিভাবে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত পূর্ণ শিক্ষা অর্জন করতে পারে না তেমনিভাবে আল্লাহের প্রতি সকল ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যনা করা পর্যন্ত সে পরিপূর্ণ মারিফত অর্জন করতে পারবে না।তাই তাই আত্মশুদ্বির অন্যতম উপায় হল অন্যতম লক্ষ্য হল এক আল্লাহের প্রতি আত্মসমর্পণ করা।
১৪.পশুত্ব চরিত্র পরিবর্জনঃ শয়তান হল মানুষের চির শত্রু।শয়তান সর্বদা মানুষকে বিভিন্ন ধরনের পাপাচারে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ব করে।এর দ্বারা কখনও আত্মশুদ্বি সম্ভভপর নয়।তাই আত্মশুদ্বি অর্জনের জন্যগীবত করা,মিথ্যা বলা,অপবাদ দেওয়া,উপহাস খাওয়া,সুদ খাওয়া,ঘুষ খাওয়া,ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদির মত জঘন্য অপরাধ হতে নিজেকে সার্বক্ষণিক মুক্ত রাখতে হবে।আল্লাহ বলেন,
“যে নিজেকে (আত্মাকে) শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনে রেথ হয়”। [শামসঃ৯-১০]
১৫. আত্মাকে স্বাভাবিক রাখাঃ আত্মাকে পাপমুক্ত রাখার মাধ্যমে একজন বান্দা অন্তরে বিশুদ্বতা অর্জন করতে পারে।রাসূল(সাঃ) বলেছেন,
“শরীরের দেহে একটি মাংস আছে যদই তা পরিশুদ্ব হয় তবে গোটা শরীর পরিশুদ্ব হয়।আর যদি তা খারাপ হয়,তবে সমস্ত শরীরই খারাপ হয়।মনে রেখো তা হল কাল্ব বাদিল”।[বুখারী ও মুসলিম]
অর্থাৎ, মানুষকে চারিত্রিক দিক হতে পবিত্র রাখার জন্য অন্তরের পরিশুদ্বতার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
১৬ .পাপ হতে মুক্ত রাখাঃ নিজেকে কেউ যাবতীয় পাপকার্য থকে বিরত থাকার মাধ্যমে আত্মশুদ্বি অর্জন করতে পারে।রাসূল (সাঃ) বলেন,“মু’মিন যখন কোন পাপ করে তখন তার অন্তরে কালোদাগ পড়ে।সে যদি ক্ষমা চায় তাহলে তা দূর হয়ে যায়।”
১৭.আল্লাহের গুণে গুণান্বিতঃ আল্লাহ পাকের কতিপয় গুণাবলী যার গুণে গুণ্বানিত হয়ে আত্মশুদ্বি অর্জন করা যায়।আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর গুণে গুণ্বানিত হও।”
১৮.দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সম্পাদনঃ দাওয়ার এবং তাবলীগী কাজের দ্বারা আত্মশুদ্বি অর্জন করা যায়।আল্লাহ বলেন,
“ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর উত্তম কথা কার হতে পারে যে কথা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে আর নিজে নেক আমল করে আর বলে আমি মুসলমানদের একজন।”[হামীম-সিজদাহঃ৩১]
উপসংহারঃ
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, মানব জ়ীবনে আত্মশুদ্বির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং তার উত্তম বন্ধু হওয়ার জন্য আমাদেরকে উপরোক্ত নিয়মানুযায়ী আত্মাকে পরিশুদ্বকরতে হবে।
No comments:
Post a Comment